৬৪/৫৫. অধ্যায়ঃ
মহান আল্লাহর বাণীঃ
﴾وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُدْبِرِينَ (٢٥) ثُمَّ أَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ إِلَى قَوْلِهِ غَفُورٌ رَحِيمٌ (٢٧)﴿এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে গর্বিত করে তুলেছিল; কিন্তু সে সংখ্যাধিক্য তোমাদের কোনো কাজে আসেনি এবং সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল তোমাদের প্রতি এ পৃথিবী এত প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও, পরে তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়েছিলে। অতঃপর আল্লাহ নিজের তরফ থেকে প্রশান্তি অবতীর্ণ করলেন তাঁর রাসূলের প্রতি এবং মুমিনদের প্রতি, আর তিনি অবতীর্ণ করলেন এমন এক সেনাবাহিনী যাদের তোমরা দেখতে পাওনি। তিনি কাফিরদের শাস্তি দিলেন এবং তা ছিল কাফিরদের কর্মফল। আর আল্লাহ এরপরও তাওবার তাওফীক দেন যাদের ইচ্ছা করেন। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আত-তাওবা ৯/২৫-২৭)"
হাওয়াযিনের তাওবা ও বন্দী ফেরত: ন্যায়ভিত্তিক দয়ার হাদিস
সহিহ বুখারী : ৪৩১৯
সহিহ বুখারীহাদিস নম্বর ৪৩১৯
سَعِيْدُ بْنُ عُفَيْرٍ قَالَ حَدَّثَنِي اللَّيْثُ حَدَّثَنِيْ عُقَيْلٌ عَنْ ابْنِ شِهَابٍ ح و حَدَّثَنِيْ إِسْحَاقُ حَدَّثَنَا يَعْقُوْبُ بْنُ إِبْرَاهِيْمَ حَدَّثَنَا ابْنُ أَخِي ابْنِ شِهَابٍ قَالَ مُحَمَّدُ بْنُ شِهَابٍ وَزَعَمَ عُرْوَةُ بْنُ الزُّبَيْرِ أَنَّ مَرْوَانَ وَالْمِسْوَرَ بْنَ مَخْرَمَةَ أَخْبَرَاهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَامَ حِيْنَ جَاءَهُ وَفْدُ هَوَازِنَ مُسْلِمِيْنَ فَسَأَلُوْهُ أَنْ يَرُدَّ إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ وَسَبْيَهُمْ فَقَالَ لَهُمْ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَعِيْ مَنْ تَرَوْنَ وَأَحَبُّ الْحَدِيْثِ إِلَيَّ أَصْدَقُهُ فَاخْتَارُوْا إِحْدَى الطَّائِفَتَيْنِ إِمَّا السَّبْيَ وَإِمَّا الْمَالَ وَقَدْ كُنْتُ اسْتَأْنَيْتُ بِكُمْ وَكَانَ أَنْظَرَهُمْ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم بِضْعَ عَشْرَةَ لَيْلَةً حِيْنَ قَفَلَ مِنْ الطَّائِفِ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم غَيْرُ رَادٍّ إِلَيْهِمْ إِلَّا إِحْدَى الطَّائِفَتَيْنِ قَالُوْا فَإِنَّا نَخْتَارُ سَبْيَنَا فَقَامَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فِي الْمُسْلِمِيْنَ فَأَثْنَى عَلَى اللهِ بِمَا هُوَ أَهْلُهُ ثُمَّ قَالَ أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ إِخْوَانَكُمْ قَدْ جَاءُوْنَا تَائِبِيْنَ وَإِنِّيْ قَدْ رَأَيْتُ أَنْ أَرُدَّ إِلَيْهِمْ سَبْيَهُمْ فَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يُطَيِّبَ ذَلِكَ فَلْيَفْعَلْ وَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يَكُوْنَ عَلَى حَظِّهِ حَتَّى نُعْطِيَهُ إِيَّاهُ مِنْ أَوَّلِ مَا يُفِيْءُ اللهُ عَلَيْنَا فَلْيَفْعَلْ فَقَالَ النَّاسُ قَدْ طَيَّبْنَا ذَلِكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِنَّا لَا نَدْرِيْ مَنْ أَذِنَ مِنْكُمْ فِيْ ذَلِكَ مِمَّنْ لَمْ يَأْذَنْ فَارْجِعُوْا حَتَّى يَرْفَعَ إِلَيْنَا عُرَفَاؤُكُمْ أَمْرَكُمْ فَرَجَعَ النَّاسُ فَكَلَّمَهُمْ عُرَفَاؤُهُمْ ثُمَّ رَجَعُوْا إِلَى رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَأَخْبَرُوْهُ أَنَّهُمْ قَدْ طَيَّبُوْا وَأَذِنُوْا هَذَا الَّذِيْ بَلَغَنِيْ عَنْ سَبْيِ هَوَازِنَ.
মারওয়ান এবং মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিগণ যখন মুসলিম হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকটে এলো এবং তাদের (যুদ্ধে ফেলে যাওয়া) সম্পদ ও বন্দীদেরকে ফেরত দেয়ার প্রার্থনা জানালো, তখন তিনি দাঁড়ালেন এবং তাদের বললেন, “আমার সঙ্গে যারা আছে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সত্য কথাই আমার কাছে অধিক প্রিয়। কাজেই তোমরা যুদ্ধবন্দী অথবা সম্পদ- এ দুটির যে কোন একটিকে গ্রহণ করতে পার। আমি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”বস্তুতঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তায়েফ থেকে ফিরে আসার পথে দশ রাতেরও অধিক সময় তাদের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। (বর্ণনাকারী বলেন) হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিদের কাছে যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে এ দুটির মধ্যে একটির অধিক ফেরত দিতে সম্মত নন, তখন তারা বললেন, “আমরা আমাদের বন্দীদেরকে গ্রহণ করতে চাই।”তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুসলিমদের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর যথাযোগ্য হামদ ও সানা পাঠ করে বললেন, “আম্মা বা’দু, তোমাদের (মুসলিম) ভাইয়েরা তাওবা করে আমাদের কাছে এসেছে, আমি তাদের বন্দীদেরকে তাদের নিকট ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অতএব তোমাদের মধ্যে যে আমার এ সিদ্ধান্তকে খুশি মনে গ্রহণ করবে, সে (বন্দী) ফেরত দিক। আর তোমাদের মধ্যে যে তার অংশের অধিকারকে অবশিষ্ট রেখে তা এভাবে ফেরত দিতে চাইবে যে, ফাইয়ের সম্পদ থেকে (আগামীতে) আল্লাহ আমাকে সর্বপ্রথম যা দান করবেন তা দিয়ে আমি তার এ বন্দীর মূল্য পরিশোধ করব, তবে সে তাই করুক।”তখন সকল লোক উত্তর করলঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার প্রথম সিদ্ধান্ত খুশিমনে গ্রহণ করলাম।”রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, “তোমাদের মধ্যে এ ব্যাপারে কে খুশিমনে অনুমতি দিয়েছে আর কে খুশিমনে অনুমতি দেয়নি আমি তা বুঝতে পারিনি। তাই তোমরা ফিরে যাও এবং তোমাদের মধ্যকার বিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ কর। তাঁরা আমার কাছে বিষয়টি পেশ করবে।”সবাই ফিরে গেল। পরে তাদের বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ তাদের সঙ্গে আলাপ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ফিরে এসে জানাল যে, সবাই তাঁর (প্রথম) সিদ্ধান্তকেই খুশি মনে মেনে নিয়েছে এবং (যুদ্ধবন্দী ফেরত দেয়ার) অনুমতি দিয়েছে। [ইমাম ইবনু শিহাব যুহরি (রহঃ) বলেন] হাওয়াযিন গোত্রের বন্দীদের বিষয়ে এ হাদীসটিই আমার কাছে পৌঁছেছে।
[২৩০৭, ২৩০৮] (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৯৭৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৩৯৮১)
সহিহ বুখারী হাদিস ৪৩১৯-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিরা মুসলিম হয়ে নবী صلى الله عليه وسلم-এর কাছে আসে। তারা তাদের সম্পদ ও বন্দীদের ফেরত চায়। নবী صلى الله عليه وسلم তাদের সামনে বাস্তব অবস্থা তুলে ধরেন—তাঁর সঙ্গে মুসলিমরা আছে এবং সত্য কথা তাঁর কাছে প্রিয়। তাই তিনি বলেন, তারা সম্পদ বা বন্দীর মধ্যে একটি বেছে নিক। তারা বন্দীদের বেছে নেয়। এরপর নবী صلى الله عليه وسلم মুসলিমদের সামনে বলেন, হাওয়াযিনের লোকেরা তাওবা করে এসেছে এবং তিনি তাদের বন্দী ফেরত দিতে চান। কিন্তু তিনি মুসলিমদের অধিকার উপেক্ষা করেননি। যারা খুশিমনে দেবে তারা দেবে, আর যারা নিজেদের অংশের অধিকার রাখতে চায় তাদের জন্য ভবিষ্যতে প্রতিদানের কথা বলা হয়। লোকেরা সম্মতি দিলেও নবী صلى الله عليه وسلم নেতাদের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করলেন। এই বর্ণনা ক্ষমা ও অধিকার—দুটির ভারসাম্য শেখায়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- ক্ষমা করতে হলেও মানুষের অধিকারকে উপেক্ষা করা হয়নি।
- তাওবা করে ফিরে আসা মানুষকে গ্রহণের দরজা দেখা যায়।
- সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্টদের মত জানা গুরুত্বপূর্ণ।
- নবী صلى الله عليه وسلم সত্য কথা, দয়া ও ন্যায়কে একসঙ্গে রেখেছেন।
