রজব মাস ২০২৬: ফজিলত, প্রচলিত ভুল ধারণা ও সুন্নাহসম্মত আমল

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১৪ মে, ২০২৬·

ইসলামিক বর্ষপঞ্জির সপ্তম মাস হলো পবিত্র 'রজব' মাস। এটি মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ঘোষিত চারটি সম্মানিত মাস বা 'আশহুরুল হুরুম'-এর অন্যতম একটি। রজব মাস আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে এক মহান বার্তা নিয়ে—তা হলো পবিত্র মাহে রমজানের আগমনী বার্তা। এ মাসটি আধ্যাত্মিক বসন্তের সূচনা করে, যা মুমিনদের রমজানের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। তবে রজব মাসকে কেন্দ্র করে সমাজে যেমন অনেক ফজিলত রয়েছে, তেমনি কিছু অমূলক ধারণা ও দুর্বল আমলও প্রচলিত রয়েছে। আজকের প্রবন্ধে আমরা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে রজব মাসের ফজিলত, প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা এবং সুন্নাহসম্মত আমলসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।

১. পবিত্র কুরআনে রজব মাস: আশহুরুল হুরুম

পবিত্র রজব মাস আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ ও মর্যাদাপ্রাপ্ত একটি মাস। আল-কুরআনে এই সম্মানিত মাসগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে:

إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ

অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি, আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত বা নিষিদ্ধ মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। অতএব, তোমরা এই মাসগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম করো না। (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৬)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজের ভাষণে এই চার মাসের বিবরণ দিয়ে বলেছেন, এর মধ্যে তিনটি মাস হলো ধারাবাহিক—জুলকাদ, জুলহিজ্জাহ ও মুহাররম; আর চতুর্থটি হলো রজব, যা জুমাদাল আখিরা ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী সময়ে অবস্থিত (সহিহ বুখারি)। সম্মানিত মাসসমূহে যুদ্ধবিগ্রহ এবং অন্যায় কাজ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ সময়ে গুনাহের ভয়াবহতা যেমন সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি, তেমনি নেক আমলের সওয়াব ও মর্যাদাও অনেক বেশি।

২. রজব মাস নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ও আমল

আমাদের সমাজে প্রচলিত বেশ কিছু প্রথা ও আমল রয়েছে, যা ইসলামের সহিহ উৎস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি:

  • ২৭ শে রজব ও শবে মিরাজ: অনেক মুসলমান মনে করেন যে, ২৭ শে রজবের রাতে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল এবং এই নির্দিষ্ট রাতে বিশেষ নামাজ, আলোকসজ্জা বা পরদিন রোজা রাখার বিশেষ সওয়াব রয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মিরাজের নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) সহ বিশিষ্ট মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন যে, মিরাজের রাত ও রজব মাসকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কোনো সালাত বা ইবাদতের সহিহ কোনো দলিল নেই।
  • রগায়েব সালাত (সালাতুল রগায়েব): রজব মাসের প্রথম জুমার রাতে নির্দিষ্ট নিয়মে ১২ রাকাত নামাজ পড়ার একটি প্রথা অনেক জায়গায় দেখা যায়। ইসলামিক স্কলারদের ঐকমত্য অনুযায়ী, এই নামাজের বর্ণনাটি সম্পূর্ণ জাল এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) কিংবা সাহাবায়ে কেরাম থেকে এর কোনো ভিত্তি নেই।
  • নির্দিষ্ট পন্থায় পুরো মাস রোজা রাখা: রজব মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে রোজা রাখলে হাজার বছরের সওয়াব পাওয়া যায়—এমন অনেক বর্ণনা প্রচলিত আছে, যার কোনোটিই সহিহ নয়। রজব মাসকে অন্যান্য সাধারণ মাসের মতোই বিবেচনা করতে হবে এবং বিশেষ কোনো দিনকে ফজিলতপূর্ণ মনে করে রোজা রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে।

৩. রজব মাসের বিখ্যাত দোয়া: একটি পর্যালোচনা

রজব মাস শুরু হলে আমরা প্রায়শই একটি বিখ্যাত দোয়া পড়তে শুনি। আসুন দোয়াটি এবং এর হাদিসতাত্ত্বিক মান জেনে নিই:

اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ وَشَعْبَانَ وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শা'বানা ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।

মুহাদ্দিসগণের মতে, এই দোয়াটি যে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে (মুসনাদে আহমাদ, শুআবুল ঈমান), তার সানাদ বা সূত্র দুর্বল (দাঈফ)। তবে বরকত পাওয়ার জন্য এবং রমজানে পৌঁছানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে এই দোয়াটি সাধারণ দোয়া হিসেবে পাঠ করা জায়েজ এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। তবে এটিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুনিশ্চিত সুন্নাহ মনে করা উচিত নয়।

৪. রজব মাসে মুমিনদের করণীয় ও সুন্নাহসম্মত আমল

রজব মাসে কোনো নতুন বা বানোয়াট ইবাদত উদ্ভাবন না করে, আল্লাহর রাসুল (সা.) এবং সাহাবিদের অনুসৃত সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করাই হলো আসল ইবাদত। এই মাসে আমরা নিচের নেক আমলগুলো করতে পারি:

  1. তওবা ও ইস্তিগফার করা: যেহেতু এটি সম্মানিত মাস, তাই নিজের অতীত গুনাহের জন্য লজ্জিত হয়ে বেশি বেশি ইস্তিগফার করা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসা আবশ্যক।
  2. সুন্নাহসম্মত নফল রোজা রাখা: প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার এবং প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে (আইয়ামে বীজ) নফল রোজা রাখার সাধারণ সুন্নাহ রজব মাসেও বজায় রাখা উচিত।
  3. কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির বাড়ানো: রমজানের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে এখন থেকেই প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত এবং জিকির-আজকারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।
  4. রমজানের মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি: প্রখ্যাত তাবিঈ আবু বকর আল-ওয়াররাক (রহ.) বলেন—'রজব হলো বীজ বপনের মাস, শাবান হলো গাছে পানি দেওয়ার মাস এবং রমজান হলো ফসল কাটার মাস।' তাই রজব থেকেই আমাদের রমজানের পরিকল্পনা সাজানো উচিত।
রজব মাসে কি রোজা রাখার বিশেষ কোনো ফজিলত রয়েছে?
রজব মাসে আলাদাভাবে নির্দিষ্ট কোনো দিনে রোজা রাখার বিশেষ সওয়াবের কথা সহিহ হাদিসে আসেনি। তবে সম্মানিত মাস হিসেবে এই মাসে নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। বিশেষ করে আইয়ামে বীজ (চাঁদের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখ) এবং সোম ও বৃহস্পতিবারের নিয়মিত রোজা রাখা উত্তম।
২৭ শে রজব শবে মিরাজ উপলক্ষে বিশেষ কোনো নামাজ বা রোজা আছে কি?
না, ২৭ শে রজবকে নির্দিষ্টভাবে মিরাজের রাত ধরে নিয়ে শবে মিরাজ পালন করা কিংবা এই রাতে বিশেষ ইবাদত ও পরদিন রোজা রাখার সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান ইসলামে নেই। এটি শরিয়তসম্মত কোনো সুন্নাহ আমল নয়, বরং এটি পরিহার করাই উত্তম।
'আল্লাহুম্মা বারিক লানা...' দোয়াটি পড়া কি বৈধ?
জি, দোয়াটি পাঠ করা সম্পূর্ণ বৈধ। যদিও এই দোয়াটির হাদিসের মান দুর্বল (দাঈফ), তবে রমজান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে আল্লাহর কাছে বরকতের এই দোয়াটি সাধারণ দোয়া হিসেবে পাঠ করাতে কোনো বাধা নেই।
রজব মাসের প্রধান শিক্ষা কী?
রজব মাসের প্রধান শিক্ষা হলো অন্যায় ও গুনাহ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা এবং আসন্ন রমজানুল মোবারকের জন্য নিজের মন ও আত্মাকে প্রস্তুত করে তোলা।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না

রজব মাস ২০২৬: ফজিলত, প্রচলিত ভুল ধারণা ও সুন্নাহ