ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে মুক্তির উপায়: সহিহ মুসলিমের ৩৬১ নম্বর হাদিসের অমর শিক্ষা

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
১০ জুন, ২০২৬·

ইসলামের সঠিক পথ ও আকিদা বোঝার ক্ষেত্রে কেবল নিজের বুদ্ধি বা খণ্ডিত জ্ঞানের ওপর নির্ভর করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তার এক জীবন্ত দলিল হলো সহিহ মুসলিমের ৩৬১ নম্বর হাদিস। এই হাদিসটিতে এমন এক ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ রয়েছে, যা আমাদের শেখায় কীভাবে চরমপন্থা ও ভ্রান্ত চিন্তার অন্ধকারে নিমজ্জিত একদল মানুষ সাহাবিদের সাহচর্যে এসে আলোর সন্ধান পেয়েছিলেন। আধুনিক যুগের তরুণ সমাজ এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

হাদিসের প্রেক্ষাপট: একদল বিভ্রান্ত যুবকের চরমপন্থী ভাবনা

হাদিসটির বর্ণনাকারী হলেন ইয়াজিদ আল ফাকীর (রহ.)। তিনি শৈশবে এবং তরুণ বয়সে এক মারাত্মক তাত্ত্বিক সংকটে পড়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে \"খারিজী\" নামক একটি চরমপন্থী দলের ভাবাদর্শ তার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই দলটির মূল দাবি ছিল—কোনো মুসলিম যদি কবিরা গুনাহ বা বড় কোনো পাপে লিপ্ত হয়, তবে সে চিরকালের জন্য কাফের হয়ে যাবে এবং মৃত্যুর পর চিরকাল জাহান্নামে দগ্ধ হবে, কখনো মুক্তি পাবে না।

এই চরমপন্থী ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ইয়াজিদ আল ফাকীর এবং তার সমমনা একদল তরুণ হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল হজ্জ শেষ করেই তৎকালীন মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং সহিংসতায় লিপ্ত হওয়া। আজকের আধুনিক সমাজেও যেভাবে কিছু তরুণ বিভ্রান্ত হয়ে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে, ঠিক একইভাবে ইয়াজিদ এবং তার দলটিও খণ্ডিত জ্ঞান ও আবেগের বশবর্তী হয়ে বড় ধরনের ভুলের পথে পা বাড়িয়েছিলেন।

মদীনার মসজিদে এক আলোর দিশারী

হজ্জের সফরে যাওয়ার পথে ইয়াজিদ ও তার দলবল মদীনা শরীফে যাত্রা বিরতি করেন। মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে তারা দেখতে পান, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর মহান সাহাবি হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) একটি খুঁটির পাশে বসে অত্যন্ত শান্তভাবে মানুষদেরকে দ্বীনের শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও হাদিস বর্ণনা করছিলেন।

আলোচনার এক পর্যায়ে হযরত জাবির (রা.) \"জাহান্নামীদের\" (জাহান্নামিয়্যিন) কথা উল্লেখ করলেন—অর্থাৎ যারা পাপের কারণে জাহান্নামে যাবে, কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহর রহমতে এবং রাসুল (সা.)-এর সুপারিশে (শাফায়াত) সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

এই কথা শুনে চরমপন্থী ভাবধারায় বিশ্বাসী তরুণ ইয়াজিদ আল ফাকীর উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি সাহাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বসলেন। ইয়াজিদ কুরআনের কিছু আয়াত খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করে বললেন, \"হে আল্লাহর রাসুলের সাহাবি! আপনারা একি কথা বলছেন? যেখানে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, যাকে আপনি আগুনে নিক্ষেপ করলেন, তাকে তো নিশ্চয়ই অপদস্থ করলেন (সূরা আল-ইমরান: ১৯২)। আল্লাহ আরও বলেছেন, যখনই তারা জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে সেখানে ফিরিয়ে দেওয়া হবে (সূরা সেজদাহ: ২০)। তাহলে আপনারা কীভাবে বলছেন যে পাপী ব্যক্তিরা একসময় জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে?\"

হযরত জাবিরের প্রজ্ঞা ও মমতাময়ী সমাধান

হযরত জাবির (রা.) একজন যুবকের এমন রুক্ষ প্রশ্ন শুনে রেগে যাননি বা তাকে ধমক দেননি। বরং অত্যন্ত স্নেহ ও প্রজ্ঞার সাথে জানতে চাইলেন, \"তুমি কি কুরআন পড়ো?\" ইয়াজিদ উত্তর দিলেন, \"হ্যাঁ, আমি কুরআন পড়ি\"।

হযরত জাবির (রা.) তখন তাকে বলেন, \"তাহলে তুমি কি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই বিশেষ উচ্চ মর্যাদা তথা ‘মাকামে মাহমুদ’ (প্রশংসিত স্থান)-এর কথা শোনোনি, যেখানে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে সমাসীন করবেন?\" ইয়াজিদ বললেন, \"হ্যাঁ, শুনেছি\"।

হযরত জাবির (রা.) পরম মমতায় বুঝিয়ে বললেন, সেই মাকামে মাহমুদের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্যই হলো মহানবী (সা.)-এর শাফায়াত বা সুপারিশ করার ক্ষমতা। এর মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা বহু মুমিন বান্দাকে তাদের পাপের শাস্তি শেষ হওয়ার পর জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণীটি হাদিসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

فَإِنَّهُ مَقَامُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم الْمَحْمُودُ الَّذِي يُخْرِجُ اللَّهُ بِهِ مَنْ يُخْرِجُ

উচ্চারণ: ফাইন্নাহু মাক্বামু মুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামাল মাহমূহুদুল্লাজি ইউখরিজুল্লাহু বিহি মাই ইউখরিজ।

অর্থ: এটিই হলো হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সেই প্রশংসিত স্থান (মাকামে মাহমুদ), যার উসিলায় আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে যাদের বের করার, বের করবেন।

সাহাবি হযরত জাবির (রা.) এরপর পুলসিরাত এবং জাহান্নাম থেকে একদল মানুষের মুক্তির বর্ণনা দিলেন। তিনি বললেন, তারা জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হয়ে একেবারে কালো কয়লার মতো হয়ে যাবে। এরপর তাদেরকে জান্নাতের একটি নহরে স্নান করানো হবে, যার ফলে তারা ধবধবে সাদা কাগজের মতো উজ্জ্বল ও পবিত্র হয়ে বের হয়ে আসবে।

ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে সঠিক আকিদায় প্রত্যাবর্তন

হযরত জাবির (রা.)-এর মুখ থেকে অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ও আন্তরিকপূর্ণ ব্যাখ্যা শোনার পর ইয়াজিদ এবং তার বন্ধুদের চোখ খুলে গেল। তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন। তারা ভাবলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর একজন প্রত্যক্ষ সঙ্গী কখনোই মিথ্যা বলতে পারেন না। তারা নিজেদের চরমপন্থী আকিদা ত্যাগ করে ইসলামি জীবনব্যবস্থার মূল ধারা তথা মধ্যমপন্থা ও সঠিক আকিদায় ফিরে এলেন।

ইয়াজিদ আল ফাকীর পরবর্তীতে বর্ণনা করেন, \"আমরা আমাদের এলাকায় ফিরে এসে বললাম, তোমাদের ধ্বংস হোক! তোমরা কি মনে করো এই বয়োবৃদ্ধ সাহাবি আল্লাহর রাসুলের নামে মিথ্যা বলছেন? আল্লাহর শপথ! আমাদের পুরো দলের মাঝে কেবল একজন ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ সেই চরমপন্থী বিদ্রোহে অংশ নেয়নি; আমরা সবাই সঠিক আকিদায় ফিরে এসেছিলাম\"।

আধুনিক জীবনে এই হাদিসের বাস্তবসম্মত শিক্ষা

সহিহ মুসলিমের এই ৩৬১ নম্বর হাদিসটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনাই নয়, বরং বর্তমান যুগে আমাদের মানসিক প্রশান্তি, সঠিক পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সুস্থ জীবনযাপনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনা প্রদান করে:

  • ১. খণ্ডিত জ্ঞান অর্জনের ভয়াবহতা এড়ানো: শুধু কুরআনের দু-একটা আয়াত নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বিপজ্জনক। দ্বীনের জ্ঞানকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে হলে হাদিস ও সাহাবিদের ব্যাখ্যাকে সাথে নিতে হবে।
  • ২. তরুণদের সাথে প্রাজ্ঞদের সংলাপের গুরুত্ব: হযরত জাবির (রা.) তরুণ ইয়াজিদের রুক্ষ প্রশ্নের জবাবে রাগ করেননি। আজ আমাদের পরিবার ও সমাজে যদি কোনো সন্তান বা তরুণ কোনো দ্বীনি বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বা ভুল পথে পা বাড়ায়, তবে বাবা-মা এবং শিক্ষকদের উচিত ধমক না দিয়ে প্রজ্ঞা ও ভালোবাসার সাথে তাদের প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর দেওয়া।
  • ৩. আল্লাহর রহমতের ওপর আশা রাখা: চরমপন্থীরা মানুষকে হতাশ করে এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। পক্ষান্তরে, এই হাদিস আমাদের শেখায় যে মুমিনের জীবনে বড় কোনো ভুল হয়ে গেলেও আল্লাহর রহমত ও রাসুলের শাফায়াতের আশা সর্বদা জিইয়ে রাখা উচিত। এটি আমাদের মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক শক্তি জোগায়।
  • ৪. সুস্থ দলছুট মানসিকতা পরিহার করা: যেকোনো ধরনের উগ্রতা ও চরমপন্থা মানুষকে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সঠিক আকিদা আমাদের সমাজে ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে শেখায়।

তথ্যসূত্র ও নির্ভরযোগ্যতা

এই হাদিসটি সম্পূর্ণ সহিহ সূত্রে বর্ণিত। এটি পাঠকদের আকিদা সংশোধন এবং ইসলামের উদারতা অনুধাবনে অত্যন্ত সহায়ক। মূল রেফারেন্সসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

  1. সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৩৬১ (ঈমান অধ্যায়)।
  2. তাফসিরে ইবনে কাসির (সূরা আল-ইমরান এবং সূরা সেজদাহর প্রাসঙ্গিক আয়াতের ব্যাখ্যা)।
  3. ফাতহুল বারী (শাফায়াত ও মাকামে মাহমুদের বিস্তারিত আলোচনা)।
সহিহ মুসলিমের ৩৬১ নম্বর হাদিসের মূল বিষয়বস্তু কী?
এই হাদিসের মূল বিষয় হলো—ভ্রান্ত আকিদা ও চরমপন্থী চিন্তা থেকে সঠিক আকিদায় ফিরে আসার এক বাস্তব ঘটনা। যেখানে একদল তরুণ সাহাবি হযরত জাবির (রা.)-এর কাছ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুপারিশ (শাফায়াত) সংক্রান্ত হাদিস শুনে তাদের উগ্রপন্থী ধারণা পরিত্যাগ করেছিলেন.
খারিজীদের চরমপন্থী বিশ্বাসটি কেমন ছিল?
খারিজীদের চরমপন্থী বিশ্বাস ছিল যে, কোনো মুসলিম বড় কোনো পাপ বা কবিরা গুনাহ করলে সে ঈমান থেকে বের হয়ে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, তার আর কোনো ক্ষমা বা শাফায়াত পাওয়ার সুযোগ নেই.
মাকামে মাহমুদ বলতে কী বোঝায়?
মাকামে মাহমুদ হলো কিয়ামতের দিন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ প্রশংসিত মর্যাদা বা স্থান, যেখান থেকে তিনি আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে গুনাহগার মুমিনদের মুক্তির জন্য সুপারিশ বা শাফায়াত করবেন.
এই হাদিস থেকে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের জন্য কী শিক্ষা রয়েছে?
তরুণদের জন্য শিক্ষা হলো—যেকোনো ধর্মীয় বা বৈষয়িক বিষয়ে খণ্ডিত জ্ঞান নিয়ে চরম সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং সর্বদা বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ সত্য জানার চেষ্টা করা। আলেম ও সাহাবিদের ব্যাখ্যার বাইরে মনগড়া ব্যাখ্যা অনুসরণ না করা।
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না

ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে মুক্তি: সহিহ মুসলিমের ৩৬১ নম্বর হাদিস