বড় গুনাহ ও কিয়ামত: খাঁটি তওবা ও পরকালের মুক্তির সহজ পথ

আব্দুর রহমান
আব্দুর রহমান
২০ মে, ২০২৬·

বড় গুনাহ ও কিয়ামত নিয়ে মনে ভয় জাগ্রত হওয়া মোটেও নেতিবাচক নয়, যদি সেই ভয় আপনাকে আল্লাহর দিকে ধাবিত করে। মানুষ হিসেবে আমরা কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নই, কিন্তু কোনো গুনাহকে ছোট মনে করা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। এই আলোচনায় সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে বড় গুনাহ কী, কিয়ামতের দিন এর জবাবদিহি কীভাবে হবে এবং আজ থেকেই খাঁটি তওবার মাধ্যমে আল্লাহর পথে কীভাবে ফিরে আসা সম্ভব। আল্লাহর অসীম রহমত থেকে কখনো নিরাশ হবেন না।

বড় গুনাহ কী এবং কেন একে অবহেলা করা যাবে না?

বড় গুনাহ (বা কবিরা গুনাহ) বলতে এমন সব পাপকে বোঝায়, যার ব্যাপারে পবিত্র কুরআন বা সহিহ হাদিসে কঠোর শাস্তি, অভিশাপ, জাহান্নামের সতর্কতা অথবা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কথা স্পষ্টভাবে এসেছে। ছোট ভুল আর বড় গুনাহ কখনো এক নয়। সাধারণ ভুল হয়ে গেলে মানুষ লজ্জিত হয়, কিন্তু বড় গুনাহকে স্বাভাবিক বা হালকা মনে করলে মানুষের অন্তর ধীরে ধীরে কঠিন ও কলুষিত হয়ে পড়ে।

সহজ কথায়, বড় গুনাহ হলো এমন কাজ যা মানুষের ঈমানকে দুর্বল করে দেয়, অন্যের অধিকার নষ্ট করে এবং মানুষকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দেয়। শিরক করা, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা এবং পবিত্র চরিত্রের মানুষের ওপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়া—এসব কেবল ব্যক্তিগত ভুল নয়, বরং সামাজিক বিপর্যয়েরও মূল কারণ। তাই এগুলো থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলিমের অন্যতম প্রধান ফরজ দায়িত্ব।

তবে সর্বদা মনে রাখা প্রয়োজন যে, বড় গুনাহ যতই মারাত্মক হোক না কেন, আল্লাহর ক্ষমা ও দয়া তার চেয়েও অনেক বেশি প্রশস্ত। শর্ত কেবল একটিই—বান্দা যেন গুনাহকে ভালো না বাসে, গোপনে তা নিয়ে অহংকার না করে এবং তওবার দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই আল্লাহর দরবারে ফিরে আসে। এই ভয় ও আশার দোলাচলের মধ্য দিয়েই একজন মুমিনের জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে।

বড় গুনাহ ও কিয়ামত: জবাবদিহির ভয়াবহ চিত্র

বড় গুনাহ ও কিয়ামত—এই দুটি বিষয় যখন একসাথে চিন্তা করা হয়, তখন মুমিনের অন্তর কেঁপে ওঠে। কারণ কিয়ামতের ময়দানে মানুষের বাহ্যিক পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা বা মুখের ফাঁকা দাবি কোনো কাজে আসবে না। সেদিন প্রত্যেকের আমলনামা তাদের সামনে প্রকাশ করা হবে এবং হাত, পা, চোখ, কান ও জিহ্বা নিজ নিজ কৃতকর্মের সাক্ষী দেবে। মানুষ তখন হাড়ে হাড়ে টের পাবে যে, দুনিয়ার কোনো গোপন পাপই আসলে গোপন ছিল না।

কিয়ামতের দিন আল্লাহর অধিকারের পাশাপাশি মানুষের অধিকার বা হকের হিসাবও নেওয়া হবে। কেউ যদি অন্যের সম্পদ হরণ করে, কারও সম্মানহানি করে, গীবত করে, মিথ্যা অপবাদ দেয় বা কারও ওপর জুলুম করে, তবে কেবল আল্লাহর কাছে তওবা করলেই সেই পাপ মুছে যায় না। যার হক নষ্ট হয়েছে, তার কাছে ক্ষমা চাওয়া বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া অপরিহার্য। এই কাজটি দুনিয়াতে কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু কিয়ামতের ভয়াবহ শাস্তির চেয়ে এটি অত্যন্ত সহজ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সতর্ক করে বলেছেন, কিয়ামতের দিন প্রকৃত দেউলিয়া বা নিঃস্ব হবে সেই ব্যক্তি, যে অনেক নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও ওপর অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে কিংবা কারও রক্ত ঝরিয়েছে। ফলশ্রুতিতে তার নেকিগুলো ক্ষতিগ্রস্তদের দিয়ে দেওয়া হবে। এটি আমাদের জন্য এক মস্ত বড় সতর্কবাণী। বাহ্যিক ইবাদত করার পাশাপাশি অন্যের প্রতি জুলুম পরিহার করা কতটা জরুরি, তা এখান থেকেই স্পষ্ট হয়।

কুরআনে বড় গুনাহ ও কিয়ামতের আগে তওবার আহ্বান

মহিমান্বিত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনে বড় গুনাহ বর্জনকারীদের জন্য এক অনন্য আশার বাণী শুনিয়েছেন। সূরা আন-নিসায় আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন:

إِن تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّরْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلًا كَرِيمًا

অর্থ: তোমরা যদি নিষিদ্ধ বড় গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকো, তবে আমি তোমাদের ছোটখাটো গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব। (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩১)

আবার সূরা আত-তাহরীমে আল্লাহ মুমিনদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো। অর্থাৎ, তওবা কেবল মুখে উচ্চারিত কোনো শব্দ নয়; বরং তা হলো অন্তর পরিবর্তন করা, গুনাহের পথ চিরতরে বর্জন করা এবং ভুল হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। কিয়ামতের পূর্বে এটিই বান্দার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا

অর্থ: হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো। (সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৮)

সাতটি ধ্বংসকারী বড় গুনাহ, যা থেকে এখনই বাঁচতে হবে

রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি হাদিসে বিশেষ সাতটি ধ্বংসকারী গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসে এগুলোকে "মুবিকাত" বলা হয়েছে, যার অর্থ হলো এমন সব পাপ যা মানুষকে পার্থিব ও পরকালীন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। যদিও বড় গুনাহ কেবল এই সাতটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তবে এগুলো সবচেয়ে বেশি মারাত্মক:

১. আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা

শিরক হলো সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্টতম অপরাধ। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ইবাদতের যোগ্য মনে করা বা আল্লাহর একক কর্তৃত্বে অন্য কাউকে অংশীদার করা ঈমানের মূল ভিত্তিকেই ধ্বংস করে দেয়। মানুষ অনেক সময় কুসংস্কার, অতিরিক্ত ভয় বা অজ্ঞতার বশে এতে জড়িয়ে পড়ে। তাই বিশুদ্ধ তাওহিদের জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।

২. জাদু করা বা জাদুর সাহায্য নেওয়া

জাদুটোনা মানুষের ঈমান, পারিবারিক বন্ধন, মানসিক ভারসাম্য এবং সামাজিক শান্তিকে বিনষ্ট করে। কেউ যদি কারও ক্ষতি করতে শয়তানি শক্তির আশ্রয় নেয়, তবে সে ঈমান হারিয়ে কুফরির অন্ধকারে পতিত হয়। যেকোনো সমস্যায় শরিয়তসম্মত দোয়া, রুকইয়াহ এবং আল্লাহর ওপর ভরসার পথ বেছে নিতে হবে।

৩. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা

মানুষের জীবন আল্লাহর দেওয়া এক পরম আমানত। অন্যায়ভাবে রক্তপাত বা সহিংসতা চালানো কেবল রাষ্ট্রীয় অপরাধই নয়, বরং অন্যতম বড় গুনাহ। রাগের মুহূর্তে নিজের জিহ্বা, হাত এবং সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় এক মুহূর্তের অবিচার কিয়ামতের দিন পাহাড়সম বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

৪. সুদ খাওয়া

সুদ মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অর্থনীতি থেকে বরকত কেড়ে নেয়। সুদের ফলে একশ্রেণির মানুষ অন্যের অভাবকে পুঁজি করে শোষণের ব্যবসা চালায়। একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে সর্বদা হালাল উপার্জনের পথ অন্বেষণ করা এবং সন্দেহজনক সব ধরণের আর্থিক চুক্তি পরিহার করা উচিত।

৫. এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা

এতিমরা সমাজে সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায়। তাদের দেখাশোনা ও সম্পদ রক্ষা করা অনেক বড় সওয়াবের কাজ; কিন্তু কোনো অভিভাবক যদি নিজের স্বার্থে এতিমের অর্থ গ্রাস করে বা হিসাব কারচুপি করে, তবে তা অত্যন্ত নিকৃষ্টমানের গুনাহ। কিয়ামতের দিন এই দুর্বলদের আহাজারি আল্লাহর দরবারে খুবই ভারী প্রমাণিত হবে।

৬. যুদ্ধের ময়দান থেকে অন্যায়ভাবে পলায়ন

এটি ইসলামী শরিয়তের একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটের গুনাহ। যখন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে প্রতিরক্ষামূলক লড়াইয়ে থাকা আবশ্যক, তখন কাপুরুষতা দেখিয়ে বা ভয় পেয়ে যুদ্ধের মাঠ থেকে পালিয়ে যাওয়া বড় গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এটি সামগ্রিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।

৭. পবিত্র নারীর ওপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়া

কারও চরিত্র নিয়ে মিথ্যা গুঞ্জন রটানো অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। বিশেষ করে সচ্চরিত্রবান ও সহজ-সরল মুমিন নারীর ওপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়া মারাত্মক পাপ। বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ক্ষতিকর মন্তব্য, স্ক্রিনশট শেয়ার ইত্যাদির মাধ্যমে এই গুনাহ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই নিশ্চিত সত্যতা ছাড়া কোনো বিষয়ে মন্তব্য করা সম্পূর্ণ বর্জনীয়।

রেফারেন্স: সহিহ বুখারি: ২৭৬৬, সহিহ মুসলিম: ৮৯।

মানুষের অধিকার সংশ্লিষ্ট বড় গুনাহে তওবা করার নিয়ম

তওবা মানে কেবল আল্লাহর কাছে লোকদেখানো অনুশোচনা নয়। পাপটি যদি কেবল আল্লাহর হকের সাথে জড়িত হয়, তবে তওবা কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত প্রয়োজন: পাপটি সম্পূর্ণ বর্জন করা, কৃতকর্মের জন্য অন্তরে গভীর অনুশোচনা রাখা এবং ভবিষ্যতে সেই পাপে আর কখনো না ফেরার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা। মানুষ হিসেবে পুনরায় পাপে জড়িয়ে পড়লে আবারও হতাশ না হয়ে খাঁটি নিয়তে তওবা করতে হবে।

তবে গুনাহটি যদি কোনো মানুষের হকের সাথে সম্পর্কিত হয়, তবে চতুর্থ একটি অপরিহার্য শর্ত যুক্ত হবে—হকদারকে তার পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। কারও টাকা আত্মসাৎ করলে তা ফেরত দিতে হবে, কারও সম্মান নষ্ট করলে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। কোনো কারণে সরাসরি বলতে গেলে যদি নতুন কোনো বিপত্তি বা ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তবে বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে তা মিটিয়ে ফেলতে হবে।

আপনার জীবনে কার কার পাওনা বাকি আছে, কার সাথে অন্যায় আচরণ করেছেন, কার গীবত বা পরনিন্দা করেছেন—তার একটি বাস্তব তালিকা তৈরি করুন। এরপর প্রতিদিন অল্প অল্প করে তা সমাধানের চেষ্টা করুন। আজ একটি ফোন দিয়ে ক্ষমা চাওয়া কিংবা কাল একটি ঋণ পরিশোধ করা—এভাবেই শুরু হোক আপনার পরিবর্তনের পথ। আল্লাহ বান্দার অন্তরের সদিচ্ছাটিই দেখেন।

কিয়ামতের পূর্বে তওবার সুযোগ শেষ হওয়ার আগেই ফিরে আসুন

অনেকেই ভাবেন, জীবনের শেষ বয়সে গিয়ে তওবা করে ভালো হয়ে যাব। কিন্তু মৃত্যু কখন, কার জীবনে কড়া নাড়বে তা কেউ বলতে পারে না। তাছাড়া, কিয়ামতের বড় আলামতগুলো (যেমন: পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া) প্রকাশ পাওয়ার পর তওবার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে, পশ্চিম দিগন্ত থেকে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বান্দার তওবা কবুল করা হয়। তাই তওবা করতে দেরি করা চরম বোকামি।

কিয়ামতের পূর্বে তওবা করার অর্থ হলো বর্তমানের গুনাহগুলোকে আজই বিদায় জানানো। আপনার স্মার্টফোন থেকে সব ধরণের হারাম ও অশ্লীল বিষয়বস্তু ডিলিট করে দিন। সুদের কারবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিন। কারও কুৎসা রটানো বন্ধ করুন এবং ছুটে যাওয়া সালাতগুলো কাজা আদায় করতে শুরু করুন। এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই আল্লাহর কাছে অনেক প্রিয়।

শয়তান মানুষকে মূলত দুইভাবে ফাঁদে ফেলে। প্রথমত, সে গুনাহের কাজগুলোকে অত্যন্ত সামান্য ও তুচ্ছ মনে করায়। দ্বিতীয়ত, গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর মনের ভেতর চরম হতাশা তৈরি করে বলে, "তোমার পাপ এত বেশি যে আল্লাহ তোমাকে আর কখনো ক্ষমা করবেন না।" এ দুটি ধারণাই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পাপকে কখনোই ছোট ভাবা যাবে না, আবার আল্লাহর অপার দয়া ও রহমত থেকেও কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না। এই দুয়ের মধ্যবর্তী আশাবাদী পথই হলো মুমিনের সঠিক পথ।

রেফারেন্স: সহিহ মুসলিম: ২৭০৩, জামি আত-তিরমিযি: ২৪৯৯।

বড় গুনাহ থেকে বাঁচার সহজ দৈনন্দিন রুটিন

কেবল ক্ষণিকের আবেগ দিয়ে বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল দৈনন্দিন রুটিন ও আমল:

  • নামাজ সুপ্রতিষ্ঠিত করুন: নামাজ নিয়মিত আদায় না করলে গুনাহের পথ থেকে দূরে থাকা অসম্ভব। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত বান্দাকে বারবার আল্লাহর সামনে দাঁড় করিয়ে পাপাচার থেকে বিরত রাখে।
  • নির্দিষ্ট একটি গুনাহ দূর করার প্রতিজ্ঞা নিন: একসাথে সব খারাপ অভ্যাস দূর করা কঠিন মনে হলে প্রথমে যেকোনো একটি বড় গুনাহ বর্জনের চেষ্টা করুন। যেমন: আজ থেকে আর গীবত করব না, হারাম জিনিস দেখব না কিংবা সুদের সাথে যুক্ত থাকব না।
  • ভালো সঙ্গ ও সৎ বন্ধু বেছে নিন: যে বন্ধু আপনাকে গুনাহের পথে উৎসাহিত করে সে আপনার চরম শত্রু। আর যে বন্ধু আপনাকে আল্লাহ ও পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় সে আল্লাহর বিশেষ রহমত।
  • ইস্তিগফারের আমল বাড়িয়ে দিন: সারাদিনে যেকোনো কাজের ফাঁকে ফাঁকে অন্তরের গভীর থেকে "আস্তাগফিরুল্লাহ" পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
  • প্রতিদিন আত্মপর্যালোচনা করুন: রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে অন্তত দুই মিনিট চিন্তা করুন—আজ আমি কারও হক নষ্ট করেছি কি না কিংবা কোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত ছিলাম কি না।

মনে রাখবেন, যেকোনো ভালো পরিবর্তন আসতে সময় লাগে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার চেষ্টা অব্যাহত রাখা। বান্দা যখন আল্লাহর দিকে এক পা বাড়ায়, আল্লাহ তার প্রতি রহমতের দরজা খুলে দেন।

সাধারণ প্রশ্ন

বড় গুনাহ ও কিয়ামত নিয়ে একজন মুসলিমের সবচেয়ে বড় ভয় কী হওয়া উচিত?
সবচেয়ে বড় ভয় হওয়া উচিত আল্লাহর সামনে এমন কোনো কবিরা গুনাহের বোঝা নিয়ে উপস্থিত হওয়া, যার জন্য দুনিয়ার বুকে খাঁটি তওবা করা হয়নি। এই ভয় কেবল মনের কোণে রাখলেই হবে না, বরং তা যেন সালাত কায়েম, ইস্তিগফার এবং অন্যের হক আদায়ের বাস্তব আমলের দিকে আমাদের ধাবিত করে।
বড় গুনাহ করলেই কি একজন মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়?
সব বড় গুনাহ মানুষকে সরাসরি ঈমান থেকে বা ইসলাম থেকে বের করে দেয় না (তবে শিরক ও কুফরির মতো ঈমান ভঙ্গকারী কাজগুলো ব্যতীত)। তবে কাবিরা গুনাহ ঈমানকে অত্যন্ত দুর্বল করে দেয় এবং কিয়ামতের দিন কঠোর শাস্তির সম্মুখীন করে। তাই অবিলম্বে তওবা করা আবশ্যক।
কিয়ামতের পূর্বে খাঁটি তওবা করলে কি সব বড় গুনাহ মাফ হওয়া সম্ভব?
হ্যাঁ, কোনো বান্দা যদি মৃত্যুর পূর্বে এবং তওবার দরজা বন্ধ হওয়ার আগে খাঁটি তওবা (তওবায়ে নাসুহ) করে, তবে পরম দয়ালু আল্লাহ তার সব বড় গুনাহও ক্ষমা করে দিতে পারেন। আল্লাহর অসীম রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না।
মানুষের হক নষ্ট করলে কি কেবল আল্লাহর কাছে তওবা করলেই ক্ষমা পাওয়া যাবে?
না, মানুষের অধিকার বা হক নষ্ট করলে কেবল আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া যথেষ্ট নয়। এর জন্য কিয়ামতের দিন কঠিন হিসাব দিতে হবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ করতে হবে অথবা তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।
কোনো বড় গুনাহ বারবার হয়ে গেলে আমার কী করণীয়?
যদি শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে কোনো পাপ বারবার হয়ে যায়, তবে প্রতিবারই নতুন করে খাঁটি অন্তরে তওবা করুন। একই সাথে যে সমস্ত পরিবেশ বা অভ্যাসের কারণে সেই পাপটি বারবার হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে বর্জনের বাস্তব পরিকল্পনা তৈরি করুন।
সাতটি ধ্বংসকারী গুনাহ ছাড়া আর কি কোনো বড় গুনাহ আছে?
হ্যাঁ, কাবিরা বা বড় গুনাহ কেবল এই সাতটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মূলত পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসে যে সমস্ত পাপের ব্যাপারে দুনিয়া ও আখিরাতের শাস্তি, অভিশাপ বা জাহান্নামের কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তার সবগুলোই বড় গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

শেষ কথা: আজই ফিরে আসুন

বড় গুনাহ ও কিয়ামত নিয়ে এই আলোচনা আমাদের আশাহত করার জন্য নয়, বরং উদাসীন অন্তরকে জাগ্রত করার জন্য। জীবনের যেকোনো পর্যায়ে আপনি যতই বড় ভুল করে থাকুন না কেন, আল্লাহর ক্ষমা ও তওবার দরজা এখনও উন্মুক্ত রয়েছে। আজই একটি গুনাহ বর্জনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করুন, একটি সিজদায় আল্লাহর দরবারে চোখের পানি ফেলুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

রেফারেন্স

  1. আল কুরআন, সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩১
  2. আল কুরআন, সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৮
  3. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৭৬৬
  4. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৯
  5. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৮১
  6. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৭০৩
  7. জামি আত-তিরমিযি, হাদিস নং ২৪৯৯
আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান

এসইও স্পেশালিস্ট ও কনটেন্ট রাইটার

আব্দুর রহমান একজন এসইও স্পেশালিস্ট এবং ইসলামিক কনটেন্ট রাইটার। তিনি ফিকহ, দৈনন্দিন ইবাদত, নামাজ, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তব মুসলিম জীবনধারা নিয়ে সহজ প্রবন্ধ লেখেন, যাতে পাঠকরা প্রতিদিনের জীবনে ইসলাম অনুসরণ করতে পারেন।

আপডেট থাকুন

আমাদের সর্বশেষ আপডেট ও রিলিজ মিস করবেন না

বড় গুনাহ ও কিয়ামত: খাঁটি তওবা ও মুক্তির সহজ গাইড